নির্ভরযোগ্য ১০টি লোকেশন ট্র্যাকিং ডিভাইস ও ব্যবহারের উপায়
লোকেশন ট্র্যাকিং ডিভাইস খুঁজছেন? কীভাবে কাজ করে, কোথায় ব্যবহার হয় এবং কোন
ডিভাইসগুলো সবচেয়ে ভালো—সব তথ্য একসাথে জানুন এই গাইডে। এছাড়াও GPS ট্র্যাকার,
গাড়ি ও শিশু নিরাপত্তা ডিভাইস, সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে বিস্তারিত পাবেন এক
জায়গায় ।
ট্র্যাকিং ডিভাইস আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি
ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, যানবাহন মনিটরিং এবং শিশু সুরক্ষায় ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা
হয়। GPS প্রযুক্তির মাধ্যমে এটি রিয়েল টাইম লোকেশন নির্ধারণ করে এবং মোবাইল
অ্যাপের মাধ্যমে সহজে মনিটর করা যায়। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এই ডিভাইসগুলো
ব্যক্তিগত ও পারিবারিক নিরাপত্তা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পোস্ট সূচিপত্র: লোকেশন ট্র্যাকিং ডিভাইস
- লোকেশন ট্র্যাকিং ডিভাইস কী?
- লোকেশন ট্র্যাকিং প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে?
- লোকেশন ট্র্যাকিং ডিভাইস ব্যবহারের সুবিধা
- জনপ্রিয় ১০টি লোকেশন ট্র্যাকিং প্রযুক্তির ধরন
- ট্র্যাকিং ডিভাইস কেনার আগে জরুরী বিষয় গুলো
- লোকেশন ট্র্যাকিং ডিভাইস ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা
- ভবিষ্যতে লোকেশন ট্র্যাকিং প্রযুক্তি কোথায় যাচ্ছে?
- কোন ধরনের ট্র্যাকিং ডিভাইস আপনার জন্য উপযুক্ত?
- লোকেশন ট্র্যাকার ডিভাইস সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন উত্তর- FAQ
- লোকেশন ট্র্যাকিং প্রযুক্তি সম্পর্কে আমার নিজস্ব অভিমত
লোকেশন ট্র্যাকিং ডিভাইস কী?
লোকেশন ট্র্যাকিং প্রযুক্তি কি সে সম্পর্কে অনেকের সঠিক ধারণা নেই। কখনো কি এমন
হয়েছে, মোটরসাইকেলটি কোথায় পার্ক করেছেন তা হঠাৎ মনে পড়ছে না? কিংবা পরিবারের
কেউ দূরে গিয়েছে, আর আপনি শুধু জানতে চাইছেন তিনি নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছেছেন কি
না। এমন ছোট-বড় অনেক পরিস্থিতিতে একটি ট্র্যাকিং ডিভাইস বেশ কাজে আসে।
সহজ করে বললে, ট্র্যাকিং ডিভাইস এমন একটি স্মার্ট যন্ত্র, যা কোনো ব্যক্তি,
যানবাহন, পোষা প্রাণী বা গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের অবস্থান জানতে সাহায্য করে। তবে
এখানে একটি মজার বিষয় আছে। অনেকেই ভাবেন, লোকেশন ট্র্যাকিং মানেই GPS। আসলে তা
নয়।
আধুনিক ট্র্যাকিং ডিভাইস
গুলো প্রয়োজনে GPS, মোবাইল নেটওয়ার্ক, Wi-Fi কিংবা Bluetooth–এর মতো একাধিক
প্রযুক্তি ব্যবহার করে অবস্থান নির্ণয় করতে পারে। তাই একেক ধরনের ডিভাইসের কাজ
এবং ব্যবহারও একেক রকম।
লোকেশন ট্র্যাকিং সিস্টেম কীভাবে কাজ করে?
অনেকের প্রশ্ন করেন লোকেশন ট্র্যাকিং ডিভাইস আসলে কীভাবে কাজ করে? একটি ট্র্যাকিং
ডিভাইস প্রথমে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে থাকা একাধিক GPS স্যাটেলাইট থেকে সংকেত
গ্রহণ করে। এরপর সেই সংকেতকে বিশ্লেষণ করে নিজের বর্তমান অবস্থান নির্ধারণ করে।
কিন্তু শুধু অবস্থান জানলেই কাজ শেষ হয় না।
ব্যবহারকারী যেন মোবাইল বা কম্পিউটার থেকে সেই তথ্য দেখতে পারেন, এজন্য অনেক
ডিভাইসে একটি SIM কার্ড থাকে। এটি মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সার্ভারে লোকেশন
পাঠায়। এরপর নির্দিষ্ট অ্যাপ বা ওয়েব ড্যাশবোর্ডে রিয়েল-টাইম অবস্থান দেখা
যায়। বুঝেছেন বিষয়টা? তবে সব ট্র্যাকিং ডিভাইস একইভাবে কাজ করে না।
ছোট আকারের কিছু ট্র্যাকার GPS-এর পাশাপাশি Bluetooth বা Wi-Fi ব্যবহার করে
কাছাকাছি ডিভাইসের মাধ্যমে অবস্থান শনাক্ত করে। তাই ডিভাইস কেনার আগে এটি কোন
প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, তা জেনে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
আরও একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। উঁচু ভবনের ভেতর, টানেল বা ঘন জঙ্গলে GPS
সিগন্যাল দুর্বল হতে পারে। ফলে কিছু সময়ের জন্য অবস্থান কম নির্ভুল দেখা যেতে
পারে। তাই ভালো মানের ট্র্যাকার সাধারণত GPS, মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং অন্যান্য
সেন্সরের তথ্য একসঙ্গে ব্যবহার করে আরও নির্ভুল ফলাফল দেওয়ার চেষ্টা করে।
লোকেশন ট্র্যাকিং ডিভাইস ব্যবহারের সুবিধা
বর্তমানে লোকেশন ট্র্যাকিং প্রযুক্তি ব্যবহারের সুবিধা শুধু একটি নির্দিষ্ট খাতে
সীমাবদ্ধ নয়। ব্যক্তিগত নিরাপত্তা থেকে শুরু করে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পর্যন্ত
নানা কাজে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গতভাবে আমি মনে করি এটি সঠিকভাবে
ব্যবহার করলে সময়, খরচ এবং ঝুঁকি—তিনটিই অনেকটা কমানো সম্ভব।
আপনি যদি লক্ষ্য করেন তাহলে দেখবেন এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো রিয়েল-টাইম
অবস্থান জানা। পরিবারের কোনো সদস্য ভ্রমণে থাকলে বা শিশু স্কুলে যাতায়াত করলে
প্রয়োজনে তার সর্বশেষ অবস্থান সহজেই দেখা যায়। একইভাবে গাড়ি বা মোটরসাইকেল
চুরি হলে দ্রুত অবস্থান শনাক্ত করার সুযোগও বাড়ে।
ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার অনেক। ডেলিভারি গাড়ি বা পরিবহন বহরের অবস্থান
পর্যবেক্ষণ করলে কোন রুটে বেশি সময় লাগছে, কোথায় অপ্রয়োজনীয় বিরতি হচ্ছে বা
গন্তব্যে সময়মতো পৌঁছানো যাচ্ছে কি না, তা সহজে বিশ্লেষণ করা যায়। এতে পরিচালন
ব্যয় কমানো এবং সেবার মান উন্নত করা সম্ভব। এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্মার্ট
ট্র্যাকিং সিস্টেম ব্যবহারের ফলে ব্যবসার জ্বালানি খরচ প্রায় ১৫% পর্যন্ত কমিয়ে
আনা সম্ভব।
তাছাড়া, আপনারা যারা ভ্রমণের সময় সাধের ট্রাভেল ব্যাগটি হারিয়ে যাওয়ার ভয় থাকেন।
এরকম দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিতে পারে এই । ব্যাগের ভেতর একটা ছোট ট্র্যাকার
রেখে দিলে এয়ারপোর্ট বা বাসে লাগেজ সহজেই খুঁজে পাওয়া যাবে। প্রযুক্তির এই চমৎকার
সুবিধাগুলো আমাদের সময় বাঁচায় এবং অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ থেকে আগাম সুরক্ষা দেয়। তাই
কেবল দামি গাড়িতেই নয়, লাইফস্টাইলের অংশ হিসেবেও এখন এটি দারুণ কার্যকরী।
একটি ছোট অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। একবার আমি আমার পরিচিত একজনের সঙ্গে একটি শপিং মলে
গিয়েছিলাম। তিনি গাড়িটি কোথায় পার্ক করেছিলেন, পরে সেটি মনে করতে পারছিলেন না।
অনেকক্ষণ খোঁজার পর মোবাইল অ্যাপে যুক্ত থাকা ট্র্যাকিং ডিভাইসের সর্বশেষ লোকেশন
দেখে কয়েক মিনিটের মধ্যেই গাড়িটি খুঁজে পাওয়া যায়। তখন বুঝেছিলাম, লোকেশন
ট্র্যাকিং ডিভাইস শুধু চুরি হওয়া গাড়ি খুঁজে বের করার জন্য নয়, প্রতিদিনের ছোট
ছোট ঝামেলাও সহজে সমাধান করতে পারে।
লোকেশন ট্র্যাকিং প্রযুক্তির ধরন-
১. GPS Tracker (জিপিএস ট্র্যাকার)
ধরুন, আপনি মোটরসাইকেলটি অফিসের সামনে পার্ক করে কাজ করছেন। হঠাৎ মনে হলো, বাইকটি
ঠিক আছে তো? এমন সময় একটি GPS Tracker আপনাকে কয়েক সেকেন্ডেই বাইকটির বর্তমান
অবস্থান দেখাতে পারে। এ কারণেই এটি বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় লোকেশন ট্র্যাকিং
প্রযুক্তি।
GPS Tracker মূলত পৃথিবীর চারপাশে ঘুরে বেড়ানো GPS স্যাটেলাইট থেকে অবস্থানের
তথ্য সংগ্রহ করে। এরপর একটি SIM কার্ডের মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সেই তথ্য
আপনার মোবাইল অ্যাপে পাঠায়। ফলে আপনি যেকোনো স্থান থেকে ডিভাইসটির অবস্থান দেখতে
পারেন।
এই ট্র্যাকার শুধু গাড়ি বা মোটরসাইকেলের জন্য নয়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ট্রাক,
স্কুলবাস, ডেলিভারি যান, নৌযান, এমনকি মূল্যবান যন্ত্রপাতি পর্যবেক্ষণেও এটি
ব্যবহার করা হয়। তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, ঘন ভবনের মাঝখানে, টানেলে বা
আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিংয়ে GPS সিগন্যাল কিছুটা দুর্বল হতে পারে। তাই সব সময় একই
রকম নির্ভুল ফল পাওয়া যায় না।
২. Bluetooth Tracker (ব্লুটুথ ট্র্যাকার)
অনেক সময় দেখা যায়, বাসা থেকে বের হওয়ার ঠিক আগে চাবি, মানিব্যাগ বা ব্যাগ
খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এমন ছোট কিন্তু বিরক্তিকর সমস্যার সহজ সমাধান হতে পারে
Bluetooth Tracker। এটি ছোট আকারের একটি ট্র্যাকিং ডিভাইস, যা Bluetooth-এর
মাধ্যমে আপনার স্মার্টফোনের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে এবং কাছাকাছি থাকা জিনিস দ্রুত
খুঁজে পেতে সাহায্য করে।
GPS Tracker-এর মতো এটি স্যাটেলাইট ব্যবহার করে না। তাই দীর্ঘ দূরত্বে
রিয়েল-টাইম লোকেশন দেখানোর জন্য Bluetooth Tracker উপযুক্ত নয়। সাধারণত
নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে, যেমন ৩০ থেকে ১২০ মিটারের মধ্যে, এটি সবচেয়ে ভালো কাজ
করে। চাবির রিং বা ওয়ালেটে ট্র্যাকারটি লাগিয়ে রাখলে, ফোন থেকে কমান্ড দিলেই সেটি
বিপ-বিপ আওয়াজ করে নিজের অবস্থান জানিয়ে দেয়।
অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, রেঞ্জের বাইরে গেলে কি এটি অচল? একদমই না। ২০২৬
সালে Apple বা Google-এর মতো বড় বড় কোম্পানির ক্রাউড-সোর্সড নেটওয়ার্কের কারণে,
অন্য কোনো ব্যবহারকারী আপনার হারানো ডিভাইসের পাশ দিয়ে গেলেও আপনি ম্যাপে তার শেষ
অবস্থান দেখতে পাবেন। তবে মনে রাখবেন, এটি লাইভ ট্র্যাকিংয়ের জন্য নয়, বরং হারিয়ে
যাওয়া নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস খোঁজার জন্য সেরা।
৩. Cellular Tracker (সেলুলার ট্র্যাকার)
কোনো গাড়ি যদি আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিং, বড় শপিং মল বা ঘন ভবনের মধ্যে থাকে,
তাহলে GPS সাময়িকভাবে দুর্বল হতে পারে। সে সময় Cellular প্রযুক্তি ডিভাইসটি কোন
এলাকায় আছে, তার একটি আনুমানিক ধারণা দিতে সাহায্য করে। এ কারণেই বর্তমানে অনেক
আধুনিক লোকেশন ট্র্যাকিং ডিভাইসে GPS, Cellular এবং Wi-Fi একসঙ্গে ব্যবহার করা
হয়। এতে একক প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করতে হয় না এবং ট্র্যাকিং আরও নির্ভরযোগ্য
হয়।
অনেকেই মনে করেন, Cellular Tracker মানেই শুধু একটি SIM কার্ড দিয়ে লোকেশন
পাঠানো। কিন্তু ২০২৬ সালে এই প্রযুক্তি আগের তুলনায় অনেক বেশি উন্নত হয়েছে। এখন
অনেক আধুনিক ট্র্যাকারে NB-IoT ও LTE-M প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, যা প্রচলিত
মোবাইল নেটওয়ার্কের তুলনায় কম বিদ্যুৎ খরচ করে। ফলে ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী
কিছু ডিভাইসের ব্যাটারি কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাস পর্যন্ত চলতে পারে।
আরেকটি বড় পরিবর্তন হলো eSIM প্রযুক্তি। এতে আলাদা করে প্লাস্টিকের SIM কার্ড
লাগাতে হয় না। তাই SIM খুলে ট্র্যাকার অকার্যকর করার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। এ
কারণে গাড়ি, মূল্যবান মালামাল বা দীর্ঘ সময় ট্র্যাকিং প্রয়োজন এমন কাজে
eSIM-সমর্থিত ট্র্যাকার জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
৪. Wi-Fi Positioning (ওয়াই-ফাই পজিশনিং)
আমি আগে মনে করতাম, লোকেশন জানার জন্য সব সময় GPS দরকার। কিন্তু অনেক রিসার্চ
করার পরে জানতে পারলাম বাস্তবে বড় শপিং মল, হাসপাতাল, অফিস ভবন বা
আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিংয়ের মতো জায়গায় GPS সিগন্যাল দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে Wi-Fi Positioning গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এটি আশপাশের Wi-Fi নেটওয়ার্কের তথ্য বিশ্লেষণ করে ডিভাইসের আনুমানিক অবস্থান
নির্ধারণ করে। এখন অনেক
স্মার্ট লোকেশন ট্র্যাকিং
ডিভাইসে GPS-এর পাশাপাশি Wi-Fi Positioning যুক্ত করা হচ্ছে। কারণ ইনডোর পরিবেশে
এটি অনেক সময় GPS-এর তুলনায় দ্রুত অবস্থান শনাক্ত করতে পারে। তবে এর মানে এই
নয় যে, Wi-Fi Positioning সব জায়গায় সমানভাবে কাজ করবে।
আশপাশে পর্যাপ্ত Wi-Fi নেটওয়ার্ক না থাকলে এর নির্ভুলতাও কমে যেতে পারে। যদি
আপনি এমন জায়গায় ট্র্যাকিং করতে চান, যেখানে মানুষ বেশি থাকে বা ভবনের ভেতরে
অবস্থান জানা জরুরি, তাহলে Wi-Fi সমর্থিত ট্র্যাকার বেছে নিতে আমি সাজেস্ট করবো।
৫. RFID Tracker (আরএফআইডি ট্র্যাকার)
অনেকেই ভাবেন, RFID Tracker মানেই অফিসের আইডি কার্ড দিয়ে দরজা খোলা বা উপস্থিতি
দেওয়ার প্রযুক্তি। কিন্তু এখন এর ব্যবহার অনেক বেশি। বর্তমানে বড় বড় সুপারশপ,
গুদাম, হাসপাতাল এবং কুরিয়ার কোম্পানিগুলো হাজার হাজার পণ্যের হিসাব রাখতে এই
প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করছে।
একটি উদাহরণ দিলে আপনি বিষয়টি সহজেই বুঝতে পারবেন। ধরুন, একটি গুদামে ৫ হাজারের
বেশি পণ্য রাখা আছে। একজন কর্মচারীর পক্ষে প্রতিটি পণ্য হাতে ধরে খুঁজে বের করা
অনেক কঠিন। কিন্তু প্রতিটি পণ্যে RFID ট্যাগ লাগানো থাকলে বিশেষ একটি রিডার খুব
অল্প সময়েই কোন পণ্য কোথায় আছে, তার তথ্য দেখাতে পারে। এতে সময়ও বাঁচে, ভুলও
অনেক কম হয়।
আরও মজার বিষয় হলো, এখন অনেক Rain RFID ট্যাগে আলাদা ব্যাটারি লাগে না। তাই
বছরের পর বছর সহজে ব্যবহার করা যায়। কিছু উন্নত RFID সমাধান আবার ওষুধ বা
ভ্যাকসিন পরিবহনের সময় তাপমাত্রাও পর্যবেক্ষণ করতে পারে। তবে একটি বিষয় মনে
রাখবেন, RFID দূর থেকে GPS-এর মতো লাইভ লোকেশন দেখায় না। এটি মূলত কাছাকাছি থাকা
পণ্য বা সম্পদ দ্রুত শনাক্ত করার জন্য তৈরি। তাই গুদাম বা ব্যবসায়িক কাজে এটি
দারুণ কার্যকর একটি প্রযুক্তি।
৬. NFC Tracker (এনএফসি ট্র্যাকার)
এটি কাজ করে একদম কাছ থেকে, মাত্র ৪ সেন্টিমিটার দূরত্বের মধ্যে। আপনি যদি আপনার
সাধের ক্যামেরা বা ট্রাভেল ব্যাগে একটি ছোট এনএফসি ট্যাগ লাগিয়ে রাখেন। তারপর
কোনো কারণে সেটি যদি হারিয়ে যায়, যে ব্যক্তি ওটি খুঁজে পাবেন তিনি তার
স্মার্টফোনটি ট্যাগের কাছে ধরলেই (কোনো অ্যাপ ছাড়াই) আপনার নাম, ইমেইল বা ফোন
নম্বর তার স্ক্রিনে ভেসে উঠবে। এবং খুব সহজেই শনাক্ত করতে পারবে।
২০২৬ সালের একটি সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বখ্যাত লাক্সারি
ব্র্যান্ডগুলো (যেমন- নামী ঘড়ি ও ব্যাগের কোম্পানি) তাদের আসল পণ্য প্রমাণ করতে
প্রায় ৭০% পণ্যে এখন বিশেষ এনএফসি চিপ বিল্ট-ইন করে দিচ্ছে। ক্রেতারা দোকানে গিয়ে
ফোন দিয়ে জাস্ট একটা স্ক্যান করেই বুঝে যান পণ্যটি আসল নাকি ১ নম্বর নকল। চার্জ
দেওয়ার কোনো ঝামেলা নেই, অথচ আজীবন আপনার জিনিসের মালিকানা নিশ্চিত করার জন্য এটি
সবচেয়ে সস্তা ও স্মার্ট সমাধান হতে পারে।
৭. UWB (Ultra-Wideband) Tracker
কখনো কি এমন হয়েছে, ফোনে দেখা যাচ্ছে চাবিটি কাছেই আছে, কিন্তু ঠিক কোথায়
রেখেছেন কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছেন না? UWB (Ultra-Wideband) Tracker ঠিক এমন সমস্যার
সমাধানের জন্য তৈরি। এটি সাধারণ Bluetooth ট্র্যাকারের তুলনায় অনেক বেশি
নির্ভুলভাবে কোনো জিনিসের অবস্থান খুঁজে দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে কয়েক
সেন্টিমিটারের মধ্যেও অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব।
২০২৬ সালে অনেক প্রিমিয়াম স্মার্টফোন, স্মার্ট ট্যাগ এবং স্মার্ট কার
প্রযুক্তিতে UWB-এর ব্যবহার বাড়ছে। আমার এক বন্ধুর তাদের বাসার চাবি সোফার
কুশনের নিচে পড়ে ছিল। কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিল না। তারপর সে তার UWB সমর্থিত ফোনে
চাবিটি কাছাকাছি আছে সেটাই নয়, কোন দিকে এবং কতটা দূরে আছে সেটিও নির্দেশনা
আকারে দেখতে পেয়েছিল। তাই বাড়ি, অফিস বা বড় ভবনের ভেতরে হারিয়ে যাওয়া জিনিস
খুঁজে পেতে এটি বেশ কার্যকর।
তবে একটি বিষয় জানা জরুরি। UWB Tracker ব্যবহার করতে হলে ট্র্যাকার এবং
স্মার্টফোন—দুটিতেই UWB সাপোর্ট থাকতে হবে। তাই নতুন ট্র্যাকার কেনার আগে আপনার
ফোন এই প্রযুক্তি সমর্থন করে কি না, সেটি অবশ্যই যাচাই করে নিবেন। এতে
অপ্রয়োজনীয় খরচও বাঁচবে, আর প্রযুক্তির পুরো সুবিধাও উপভোগ করতে পারবেন।
৮. LoRaWAN Tracker:
সহজ কথায়, LoRaWAN Tracker হলো এমন এক ট্র্যাকার যা
মোবাইল সিম কার্ড
ছাড়াই মাইলের পর মাইল দূর থেকে লোকেশন পাঠাতে পারে। সাধারণ জিপিএস ট্র্যাকার
যেখানে প্রতি মাসে সিমের বিল টানে এবং দ্রুত ব্যাটারি শেষ করে, সেখানে এই
প্রযুক্তি পুরো উল্টো।
লোরাওয়ান (LoRaWAN) প্রযুক্তির আসল ম্যাজিক লুকিয়ে আছে এর নামের মধ্যেই—'লং
রেঞ্জ ওয়াইড এরিয়া নেটওয়ার্ক'। এটি রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে কাজ করে। এর
বিশেষত্ব হলো, এটি খুব সামান্য বিদ্যুৎ খরচ করে প্রায় ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার দূর
পর্যন্ত সিগন্যাল পাঠাতে পারে।
একটি বাস্তব উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে: ধরুন, বিশাল এক পাহাড়ি খামারে
আপনার একপাল গবাদি পশু ছেড়ে দেওয়া আছে, যেখানে কোনো মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই।
প্রতিটি পশুর গলায় একটি ছোট লোরাওয়ান ট্র্যাকার ঝুলিয়ে দিলে, কোনো সিম খরচ ছাড়াই
আপনি বছরের পর বছর ধরে ম্যাপে তাদের লাইভ অবস্থান দেখতে পাবেন।
২০২৬ সালের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বের বড় বড় স্মার্ট সিটি প্রজেক্টে
এবং লজিস্টিকস ব্যবসায় প্রায় ৪০% খরচ কমাতে এই ট্র্যাকার ব্যবহার করা হচ্ছে।
যেহেতু এর ব্যাটারি অনায়াসে ৫ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত চলে, তাই বারবার চার্জ দেওয়ার
বা ব্যাটারি বদলানোর কোনো ঝামেলাই নেই। কম খরচে বিশাল এলাকায় ট্র্যাকিংয়ের জন্য
এটি বর্তমান সময়ের সবচেয়ে যুগান্তকারী সমাধান।
৯. Satellite Tracker (স্যাটেলাইট ট্র্যাকার)
ধরুন, আপনি পাহাড়ে ট্রেকিং করতে গেছেন বা একটি মাছ ধরার ট্রলার গভীর সমুদ্রে
রয়েছে। হঠাৎ মোবাইল নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেল। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ
ট্র্যাকার আর কাজ নাও করতে পারে। কিন্তু Satellite Tracker স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক
ব্যবহার করে অবস্থানের তথ্য পাঠাতে পারে, তাই দূরবর্তী এলাকায়ও যোগাযোগ বজায়
রাখার সুযোগ থাকে।
এই ডিভাইসটি প্রথমে GPS-এর মাধ্যমে নিজের অবস্থান নির্ণয় করে, তারপর Iridium বা
Globalstar-এর মতো স্যাটেলাইট যোগাযোগ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সেই তথ্য পাঠায়।
অনেক আধুনিক মডেলে SOS বাটনও থাকে, যা জরুরি পরিস্থিতিতে পূর্বনির্ধারিত যোগাযোগ
ব্যবস্থা বা জরুরি সহায়তা পরিষেবায় বার্তা পাঠাতে পারে।
এ কারণে পর্বতারোহী, গবেষক, সমুদ্রযাত্রী এবং দূরবর্তী এলাকায় কাজ করা দলগুলোর
কাছে এটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সরঞ্জাম হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে শহরের দৈনন্দিন
ব্যবহারের জন্য Satellite Tracker সাধারণত প্রয়োজন হয় না। কারণ এর দাম এবং
স্যাটেলাইট পরিষেবার খরচ সাধারণ GPS ট্র্যাকারের তুলনায় বেশি। তাই এটি মূলত এমন
পরিবেশের জন্য, যেখানে মোবাইল নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করা যায় না।
হাইব্রিড ট্র্যাকার কেন ২০২৬ সালের সবচেয়ে স্মার্ট সমাধান?
সাধারণ ট্র্যাকারগুলো যেখানে কেবল একটি প্রযুক্তির (যেমন শুধু জিপিএস বা শুধু সিম
কার্ড) ওপর নির্ভর করে, সেখানে Hybrid Tracker একধাপ এগিয়ে। এটি মূলত একাধিক
প্রযুক্তির একটি কম্বিনেশন। পরিস্থিতি ও পরিবেশ বুঝে এটি নিজে থেকেই সিদ্ধান্ত
নেয় যে কখন কোন সিগন্যালটি ব্যবহার করবে। এ কারণেই সবাই হাইব্রিড ট্র্যাকার অনেক
পছন্দ করে এবং এর ব্যবহার দিন দিন বেড়ে চলেছে।
১. থ্রি-ইন-ওয়ান ব্যাকআপ (GNSS, Cellular & Wi-Fi)
- একটি প্রিমিয়াম হাইব্রিড ট্র্যাকারে একসাথে তিনটি প্রযুক্তি কাজ করে। খোলা রাস্তায় এটি আকাশ থেকে GPS সিগন্যাল নেয়। আবার গাড়ি বা লাগেজ যখন কোনো কন্টেইনার, ঘন জঙ্গল বা টানেলে ঢুকে যায়, তখন এটি ১ সেকেন্ডের মধ্যে লোকাল Cellular (GSM) টাওয়ারের সাহায্য নেয়। আর যখন কোনো ভবনের ভেতরে বা আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকে, তখন চারপাশের Wi-Fi বা Bluetooth নেটওয়ার্ক স্ক্যান করে লোকেশন পাঠায়।
২. স্মার্ট ব্যাটারি সেভিং মোড:
- হাইব্রিড ট্র্যাকারের বড় গুণ হলো এর বুদ্ধিমত্তা। গাড়ি যখন জ্যামে বা পার্কিংয়ে স্থির দাঁড়িয়ে থাকে, এর ভেতরের মোশন সেন্সর (Motion Sensor) তা বুঝতে পারে। তখন এটি জিপিএস বন্ধ করে 'স্লিপ মোডে' চলে যায়, ফলে ব্যাটারি বাঁচে। গাড়ি চাকা ঘুরলেই এটি আবার সচল হয়।
৩। ব্যাটারির দীর্ঘায়ুঃ
- সাধারণ জিপিএস ট্র্যাকার সিগন্যাল না পেলে বারবার খোঁজার চেষ্টা করে দ্রুত ব্যাটারি শেষ করে ফেলে। কিন্তু হাইব্রিড ট্র্যাকার সিগন্যাল চলে গেলে প্যানিক না করে সাথে সাথে কম শক্তির ব্লুটুথ বা ওয়াই-ফাই মোডে চলে যায়। এতে ডিভাইসের ব্যাটারি লাইফ সাধারণ জিপিএস ট্র্যাকারের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ স্থায়ী হয়।
সহজ কথায়, আপনি যদি এমন একটি ডিভাইস চান যা জ্যামার দিয়ে সিগন্যাল ব্লক করলেও
অল্টারনেটিভ উপায়ে সচল থাকবে, তবে হাইব্রিড ট্র্যাকারই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে
নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তি।
লোকেশন ট্র্যাকিং ডিভাইস কেনার আগে যেসব বিষয় অবশ্যই দেখবেন
বাজারে গেলেই আপনি হয়তো অনেক রকমের ট্র্যাকার দেখবেন, কিন্তু সমস্যা হল হুজুগে
পড়ে যেকোনো একটা কিনে ফেললে পরে আফসোস করতে হতে পারে। নিজের টাকা এবং মানসিক
শান্তি—দুই-ই বজায় রাখতে ডিভাইস কেনার আগে এই ৮টি বিষয় অবশ্যই মিলিয়ে নেবেন।
- Accuracy (নিখুঁত অবস্থান): ট্র্যাকারটি যেন অন্তত ৫-১০ মিটারের মধ্যে নিখুঁত অবস্থান দেখাতে পারে। দুর্বল জিপিএস চিপ হলে ম্যাপে ভুল রাস্তা দেখাবে, যা বিপদের সময় কোনো কাজেই আসবে না।
- Battery (ব্যাটারি লাইফ): Accuracy পাশাপাশি লাইভ ট্র্যাকিং মোডে ব্যাটারি কতক্ষণ চলে তা জানাও জরুরি। এমন ডিভাইস বাছুন যা অন্তত ৩-৫ দিন ব্যাকআপ দেয়, অন্যথায় রোজ চার্জ দেওয়ার ঝামেলায় পড়তে হবে। আপনি কী কাজে ট্র্যাকার ব্যবহার করবেন, সেটি আগে ঠিক করুন। গাড়ির জন্য হার্ডওয়্যার ট্র্যাকার হলে আলাদা চার্জের প্রয়োজন নাও হতে পারে। আর পোর্টেবল ট্র্যাকার হলে ব্যাটারি ব্যাকআপ যত বেশি হবে, তত সুবিধা।
- App (সহজ অ্যাপ): ট্র্যাকিং অ্যাপের ইন্টারফেস সহজ হওয়া গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কেননা ইন্টারফেস সহজ না হলে আপনি সেটি ব্যবহার করতে সারছন্দবোধ করবেন না। নোটিফিকেশন যেন ল্যাগ বা দেরি না করে সাথে সাথে ফোনে চলে আসে সেদিকেও খেয়াল রাখুন।
- 4G ও eSIM প্রযুক্তি: ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ২জি বা ৩জি ট্র্যাকার কেনা টাকা নষ্ট করা ছাড়া কিছু নয়। দ্রুত ডেটা ট্রান্সফারের জন্য 4G সমর্থিত এবং ফিজিক্যাল সিমের ঝামেলা এড়াতে অবশ্যই eSIM যুক্ত আধুনিক ট্র্যাকার বেছে নিন। যা ভবিষ্যতের জন্য বেশি নিরাপদ হবে। এতে নেটওয়ার্ক পরিবর্তনের ঝুঁকি কম থাকে এবং দ্রুত ডেটা আদান-প্রদান করা যায়।
- Subscription (মাসিক ফি): অনেক ডিভাইসের দাম কম হলেও প্রতি মাসে বা বছরে কখনো কখনো বড় অঙ্কের সাবস্ক্রিপশন ফি দিতে হয়। কেনার আগেই এই লুকানো খরচের হিসাব পরিষ্কার করে নিন।
- Warranty (ওয়ারেন্টি): এমনও দেখা যায় ইলেকট্রনিক ডিভাইস যেকোনো সময় নষ্ট হতে পারে। তাই অন্তত ১ বছরের অফিসিয়াল ওয়ারেন্টি আছে এমন ব্র্যান্ডের ওপর ভরসা রাখুন।
- বিক্রয়-পরবর্তী সেবা: ট্র্যাকার কেনার পর যদি সেটআপ, অ্যাপ বা নেটওয়ার্ক নিয়ে সমস্যা হয়, তাহলে দ্রুত সহায়তা পাওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই নির্ভরযোগ্য বিক্রেতা বা ব্র্যান্ড থেকে কেনার চেষ্টা করুন। আমার এক বড় ভাই লোকাল সবথেকে ট্রাকার কিনে পরবর্তীতে বিক্রয় সেবা পায়নি, যা তাকে ডিভাইসটি ব্যবহার করতে অনেক বেশি সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে।
একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রায় ৩০% মানুষ ট্র্যাকার কেনার পর শুধু অ্যাপের
জটিলতা আর ব্যাটারি সমস্যার কারণে সেটি ব্যবহার করা বন্ধ করে দেয়। তাই তাড়াহুড়ো
না করে এই বিষয়গুলো যাচাই করুন এবং আপনার বাজেটের সেরা ডিভাইসটি বেছে নিন।
লোকেশন ট্র্যাকিং ডিভাইস ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা
প্রযুক্তির ভালো দিকগুলো নিয়ে তো সবাই কথা বলে, কিন্তু এর আড়ালের সীমাবদ্ধতাগুলো
জানা না থাকলে যেকোনো মুহূর্তে আপনার সাধের ডিভাইসটি অকেজো হয়ে যেতে পারে।
দোকানে গেলে বিক্রেতারা অনেক সময় এগুলো বলবে না। কিন্তু ট্র্যাকিং ডিভাইস
ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা নিয়ে সাধারণ এমন কিছু বাস্তবিক সমস্যা রয়েছে, যা কেনার আগে
আপনার অবশ্যই জানা উচিত।
- প্রথম বড় ধাক্কাটি আসে আবহাওয়া এবং তাপমাত্রার কারণে। আমরা ভাবি ট্র্যাকার মানেই যেকোনো পরিস্থিতিতে কাজ করবে। কিন্তু পরিস্থিতিভেদে লিথিয়াম ব্যাটারি চালিত ট্র্যাকারগুলো চরম গরমে (যেমন- বন্ধ গাড়ির ড্যাশবোর্ডে রোদের মধ্যে রাখলে) বা তীব্র শীতে কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এমনকি অতিরিক্ত তাপমাত্রায় ব্যাটারি ফুলে গিয়ে ডিভাইসটি স্থায়ীভাবে নষ্টও হতে পারে।
- আরেকটি গোপন টেকনিক্যাল সীমাবদ্ধতা হলো 'মাল্টি-পাথ ইন্টারফারেন্স' (Multi-path Interference)। ঢাকা বা যেকোনো বড় শহরের অনেক উঁচু উঁচু ভবনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যখন আপনি জিপিএস অন করবেন, তখন স্যাটেলাইটের সিগন্যাল সরাসরি ডিভাইসে না এসে উঁচু বিল্ডিংয়ের দেয়ালে বাড়ি খেয়ে প্রতিফলিত হয়। এর ফলে ম্যাপে আপনার অবস্থান ভুল দেখায়—হয়তো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে রাস্তায়, কিন্তু ম্যাপে দেখাবে পাশের ভবনের ভেতরে। আমার দেখা মতে বেশিরভাগ মানুষই এই সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকে।
- সবশেষে রয়েছে আইনি ও সুরক্ষার মারপ্যাঁচ। বাস্তবে দেখা যায় আপনি হয়তো সুরক্ষার জন্য কারো ব্যাগে বা গাড়িতে ট্র্যাকার লুকিয়ে রাখলেন, কিন্তু আধুনিক অ্যাপল বা গুগল ইকোসিস্টেম এখন 'অ্যান্টি-স্টকিং' (Anti-stalking) ফিচারে সমৃদ্ধ। অর্থাৎ, আপনার অজান্তে কেউ যদি আপনার ট্র্যাকার নিয়ে ঘোরে, তার স্মার্টফোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাকে অ্যালার্ট পাঠিয়ে দেবে যে "একটি অজানা ট্র্যাকার আপনার সাথে ঘুরছে"।
- ফলে গোপনে চোর ধরার যে আইডিয়া আমরা সিনেমাতে দেখি, বাস্তবে প্রযুক্তি নিজেই এখন চোরকে সাবধান করে দেয়। তাই আমার মনে হয় ট্র্যাকিং ডিভাইস কেনার আগে এই সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতাগুলো মাথায় রাখা জরুরি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গোপনীয়তা। স্বাভাবিকভাবে কারও অনুমতি ছাড়া তার
অবস্থান ট্র্যাক করা অনেক দেশে আইনগতভাবে সীমাবদ্ধ। তাই ব্যক্তিগত তথ্য ও
গোপনীয়তার বিষয়টি সব সময় গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
ভবিষ্যতে লোকেশন ট্র্যাকিং প্রযুক্তি কোথায় যাচ্ছে?
আজকের দিনে আমরা যেভাবে ম্যাপ দেখে বা ট্র্যাকার দিয়ে লোকেশন খুঁজি, আগামী কয়েক
বছরে তা পুরোপুরি বদলে যেতে চলেছে। শুধু ডট চিহ্ন দিয়ে ম্যাপে অবস্থান দেখানোর
দিন এখন শেষের দিকে। মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, ভবিষ্যতে লোকেশন ট্র্যাকিং
প্রযুক্তি কোথায় যাচ্ছে এবং এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে কতটা প্রভাবিত করবে?
- সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-এর হাত ধরে। বর্তমান ট্র্যাকারগুলো শুধু হয়তো দেখায় আপনি এখন কোথায় আছেন। কিন্তু ভবিষ্যতের ট্র্যাকারগুলো আপনার আগের চলাফেরার প্যাটার্ন অ্যানালাইসিস করে আগেই অনুমান করতে পারবে আপনি পরবর্তী ১ ঘণ্টায় কোথায় যেতে পারেন। একে বলা হচ্ছে 'প্রেডিক্টিভ ট্র্যাকিং'।
- কি কত আকর্ষণীয় বিষয় তাই না? আবার ধরুন, আপনি প্রতিদিন বিকেলে যে রাস্তায় জ্যামে পড়েন, আপনার ট্র্যাকার সেই তথ্য মাথায় রেখে আগেভাগেই আপনাকে অল্টারনেটিভ রুটের অ্যালার্ট পাঠিয়ে দেবে।
- আরেকটি বড় বৈপ্লবিক পরিবর্তন হলো ব্যাটারির ঝামেলা থেকে চিরতরে মুক্তি। গবেষকেরা এখন কাজ করছেন 'এনার্জি হারভেস্টিং' প্রযুক্তি নিয়ে। এর ফলে ভবিষ্যতের ট্র্যাকিং ডিভাইসগুলোর জন্য কোনো চার্জার বা ব্যাটারির প্রয়োজন হবে না। আপনার হাঁটাচলার গতি, চারপাশের ওয়াই-ফাই তরঙ্গের শক্তি কিংবা সামান্য সূর্যের আলো টেনেই এই ছোট চিপগুলো আজীবন সচল থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
- তাছাড়াও, মেটাভার্স এবং অগমেন্টেড রিয়েলিটি (AR) যুক্ত হচ্ছে এই ট্র্যাকিংয়ের সাথে। এমনও হতে পারে আপনি হয়তো কোনো শপিং মলে ঢুকে স্মার্ট চশমা বা ফোনের ক্যামেরা অন করবেন। আর স্ক্রিনের ওপর ভার্চুয়াল তীর চিহ্ন ভেসে উঠবে, যা আপনাকে নিখুঁতভাবে আপনার কাঙ্ক্ষিত পণ্য বা পার্কিং করা গাড়ির দিকে নিয়ে যাবে।
তবে প্রযুক্তি যত উন্নত হবে, গোপনীয়তা ও ডেটা নিরাপত্তার গুরুত্বও তত বাড়বে।
ডেটার ঝুঁকি থাকলে কেউ সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে চাইবে না। এটি ব্যবহারকারীর
ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার দিকে যেমন বেশি গুরুত্ব দেবে, তেমনি আমাদের সময় ও শ্রমকে
বাঁচাবে এবং জীবনযাত্রাকে করবে আরও বেশি সহজ, সাবলীল।
কোন ধরনের ট্র্যাকিং ডিভাইস আপনার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত?
আপনি যদি এখনো বুঝতে না পারেন কোন ধরনের ট্র্যাকার আপনার জন্য ভালো হবে, তাহলে
চিন্তার কিছু নেই। নিচের সংক্ষিপ্ত টেবিলটি আপনাকে দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে
সাহায্য করবে বলে আশা করছে।
| আপনার প্রয়োজন | উপযুক্ত ট্র্যাকিং ডিভাইস |
|---|---|
| গাড়ি বা মোটরসাইকেল | GPS Tracker |
| চাবি, ব্যাগ বা মানিব্যাগ | Bluetooth Tracker |
| ব্যবসায়িক গাড়ির বহর | Hybrid Tracker |
| স্মার্ট কৃষি বা IoT | LoRaWAN Tracker |
| ইনডোর ট্র্যাকিং | UWB Tracker |
| ভবনে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ | NFC Tracker |
| গুদাম বা শিল্প প্রতিষ্ঠানের পণ্য | RFID Tracker |
| পাহাড়, সমুদ্র বা নেটওয়ার্কবিহীন এলাকা | Satellite Tracker |
লোকেশন ট্র্যাকিং ডিভাইস সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন উত্তর
১. GPS Tracker এর দাম কত?
উত্তর: GPS Tracker-এর দাম ফিচার, ব্র্যান্ড এবং প্রযুক্তি অনুযায়ী ভিন্ন হয়।
বাংলাদেশে সাধারণ GPS Tracker কয়েক হাজার টাকা থেকে শুরু হয়। উন্নত Hybrid বা
Satellite Tracker-এর দাম আরও বেশি হতে পারে। কিছু ডিভাইসে মাসিক SIM বা সার্ভিস
চার্জও দিতে হয়।
২. GPS Jammer কী?
উত্তর: GPS Jammer এমন একটি ডিভাইস, যা GPS সিগন্যালের মধ্যে বাধা সৃষ্টি করে।
ফলে ট্র্যাকার সঠিকভাবে অবস্থান নির্ণয় করতে সমস্যায় পড়তে পারে। অনেক দেশে
নিরাপত্তার কারণে এই ধরনের ডিভাইস ব্যবহার নিষিদ্ধ।
৩. ট্র্যাকার কি সব সময় লাইভ লোকেশন দেখায়?
উত্তর: ট্র্যাকার সব সময় লাইভ লোকেশন দেখায় না। এটি ট্র্যাকারের ধরন এবং
সেটিংসের ওপর নির্ভর করে। কিছু ট্র্যাকার কয়েক সেকেন্ড পরপর লোকেশন আপডেট করে,
আবার কিছু ডিভাইস ১ থেকে ৫ মিনিট পরপর তথ্য পাঠায়। তাই কেনার আগে আপডেট
ইন্টারভ্যাল দেখে নেওয়া ভালো।
৪. ট্র্যাকার কি লুকিয়ে বসানো যায়?
উত্তর: হ্যাঁ, অনেক GPS Tracker এমনভাবে গাড়ি বা মোটরসাইকেলের ভেতরে বসানো যায়,
যা বাইরে থেকে সহজে বোঝা যায় না। তবে অন্য কারও অনুমতি ছাড়া তাকে ট্র্যাক করা
আইনগত ও নৈতিকভাবে ঠিক নয়।
৫. ফোন বন্ধ থাকলে ট্র্যাকার কি কাজ করবে?
উত্তর: যদি আলাদা GPS Tracker ব্যবহার করেন, তাহলে আপনার ফোন বন্ধ থাকলেও
ট্র্যাকার কাজ করতে পারে। পরে ফোন চালু করে অ্যাপে ঢুকলেই সর্বশেষ লোকেশন দেখতে
পারবেন। তবে ফোনের নিজের লোকেশন ব্যবহার করলে ফোন বন্ধ থাকলে ট্র্যাকিংও বন্ধ
হয়ে যাবে।
৬. GPS Tracker বসাতে কি টেকনিশিয়ান লাগবে?
উত্তর: ছোট বা ম্যাগনেটিক ট্র্যাকার আপনি নিজেই ব্যবহার করতে পারবেন। তবে গাড়ির
ব্যাটারির সঙ্গে সংযোগ দিতে হয় এমন ট্র্যাকার হলে একজন অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান দিয়ে
লাগানোই নিরাপদ।
৭. বাংলাদেশের জন্য কোন ধরনের GPS Tracker ভালো?
উত্তর: আপনি যদি ব্যক্তিগত গাড়ি বা মোটরসাইকেলের জন্য ট্র্যাকার কিনতে চান,
তাহলে GPS ও Cellular সমর্থিত Hybrid Tracker ভালো একটি বিকল্প। এটি শহর এবং
মহাসড়ক দুই জায়গাতেই তুলনামূলক ভালো কাজ করে।
৮. GPS Tracker কেনার আগে কী কী বিষয় দেখা উচিত?
উত্তর: ব্যাটারি কতক্ষণ চলে, লোকেশন কত দ্রুত আপডেট হয়, অ্যাপ ব্যবহার করা সহজ
কি না, মাসিক কোনো অতিরিক্ত খরচ আছে কি না এবং কোম্পানি নিয়মিত সফটওয়্যার আপডেট
দেয় কি না, এসব বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করলে পরে আফসোস করার সম্ভাবনা অনেক কমে
যায়।
লোকেশন ট্র্যাকিং ডিভাইস সম্পর্কে আমার নিজস্ব অভিমত
লোকেশন ট্র্যাকার জিনিসটা আমাদের মনের খুঁতখুঁতানি বা দুশ্চিন্তা দূর করার জন্য
দারুণ একটা জিনিস বলে মনে হয়েছে আমার কাছে। কিন্তু মুশকিল হলো, যখন আমরা
প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ি। সারাক্ষণ ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখে
"কে কোথায় যাচ্ছে" তা দেখতে থাকা কিন্তু এক ধরনের রোগ। অনেকেই এই কাজটি করেন। তাই
ট্র্যাকার যেন আমাদের সম্পর্কের ভেতরের বিশ্বাস আর স্বাধীনতাকে নষ্ট না করে ফেলে
সেদিকেও খেয়াল রাখা জরুরি।
তাই আমার পরামর্শ থাকবে, ডিভাইস অবশ্যই ব্যবহার করুন, তবে সেটা অন্ধের মতো নয়।
ডিভাইসটির ডেটা সিকিউরিটি এবং প্রাইভেসি পলিসি কতটা শক্তিশালী তা সবার আগে যাচাই
করুন। ভালো ব্র্যান্ডের ট্র্যাকার কিনুন যাতে আপনার ব্যক্তিগত ডেটা বা লোকেশন
অন্য কারো হাতে পাচার না হয়। প্রযুক্তিকে পাহারাদার বানান, কিন্তু নিজের জীবনের
মালিক বানাবেন না।



মাল্টিম্যাক্স আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন।
comment url